চুয়াল্লিশতম অধ্যায় রেশমের পুতুল

নির্যাস স্মৃতি লালEnvelope গ্রহণকারী 4036শব্দ 2026-03-06 09:08:43

জুনের মাঝামাঝি, সূর্য appena উঠেছে, অথচ আগুনের মতো দহনে চারদিক উত্তপ্ত। রুইশুয়েত কলসি ভর্তি জল তুলে গতকালের কাপড় ধুয়ে, বাঁশের কাঁটিতে মেলে দিল, নিজে ছোট্ট একটা পিঁড়ি হাতে নিয়ে উঠোনের দেয়ালের ছায়ায় বসে জুতো বানানোর চেষ্টা করছিল।

গরমে তার বাবা তাকে রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করেছে, ঘরেই থাকতে বলেছে—এটাকেই যেন গ্রীষ্মের ছুটি ধরা যায়।

এ সময়ে তার মনে একটু অস্থিরতা কাজ করে, কারণ সে অন্যদের দেখানোভাবে কাপড়ে নকশা এঁকে, কাটাকুটি করে, সেলাই করেছে, কিন্তু এরপর কী করতে হবে বুঝতে পারছে না। অবশেষে হাতের কাজ ফেলে দিয়ে, অলসভাবে জিভ বের করা ছোট কালো কুকুরটিকে নিয়ে খেলতে লাগল।

ছোট কালো কুকুরটিও গরমে ক্লান্ত, মাটিতে শুয়ে জিভ বের করেছে, চোখ বন্ধ। এখন একটা বালতি ঠাণ্ডা জল গায়ে ঢালা হলে তবেই সে চাঙ্গা হবে।

রুইশুয়ে কুকুরটির মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘‘কালো, বল তো, আমাদের তৃতীয় স্যার কবে ফিরবে?’’

জাও শিহৌ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে আজ দশ দিন পেরিয়েছে। যত লোক পাঠানো হয়েছে, এমনকি জাওয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী নিজে গিয়ে বুঝিয়েছে, তবুও সে ফিরতে রাজি হয়নি। এমনকি বলেছে, গত উনিশ বছরে এত আনন্দ আর কখনো পায়নি।

শোনা যায়, দ্বিতীয় স্ত্রী অনেক জিনিস পাঠিয়েছে তার দেখভালের জন্য। শুনেছে, ঋণযুক্তও সেখানে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু জাও শিহৌ তাকে নামিয়ে দিয়েছে।

‘‘কালো, সে কি করছে ওখানে? মা নিজে গিয়ে ডেকেছে, তবুও ফিরছে না।’’

কুকুরটি তবুও চোখ বন্ধ রেখেই আছে, রুইশুয়ের কথায় সাড়া দেয় না।

* * *

বৃদ্ধ জাও প্রতিদিনের মতো ভোরে ক্যালিগ্রাফি চর্চা করেন, জাও শিকিউন চুপচাপ তার জন্য মস কষছে, তার হাতের গতি ধীর, জাও শিক্সিয়াও মাঝে মাঝে একটু জল ঢালছে।

‘‘সে এখনো ফিরতে রাজি হয়নি?’’

জাও শিকিউনের হাত থেমে যায়, তারপর ধীর গলায় বলে, ‘‘হ্যাঁ।’’

বৃদ্ধ জাও কলমটা ছুঁড়ে ফেলে, মুহূর্তেই কলমটা সদ্য লেখা কাগজে গড়িয়ে পড়ে, কালি সাদা জায়গায় ছিটকে ছোট ছোট ছোপ তৈরি করে। সুন্দর লেখা নষ্ট হয়ে গেল।

‘‘আসলেই সে কেন এতদিন বাইরে থাকবে?’’

জাও শিক্সিয়াও তাড়াতাড়ি জাও শিকিউনের হাত চেপে ধরে, মাথা নাড়ে।

জাও শিকিউন মৃদু হাসে, সহজভাবে সব বলে দেয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর ব্যাপারে কিছু বলতে চায় না, এমনকি একটি বাড়তি শব্দও উচ্চারণ করে না, কেবল পুরো ঘটনা তুলে ধরে।

‘‘হুম!’’

বৃদ্ধ জাওয়ের কঠিন গর্জনে জাও শিক্সিয়াও ভয়ে কেঁপে ওঠে। তার প্রার্থনা, দয়া করে ঠাকুরদা যেন রাগে দ্বিতীয় স্ত্রীর ওপর না পড়েন, তাহলে সে বিপদে পড়ে যাবে। বৃদ্ধের সামনে সে হাতজোড় করে প্রার্থনা করতে পারে না, শুধু মনে মনে সূত্র পাঠ করে, বুদ্ধের আশীর্বাদ কামনা করে।

কোনো প্রচণ্ড রাগ, কোনো ভর্ৎসনা নেই, এতে জাও শিক্সিয়াও বিস্ময়ে মাথা তোলে। পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা জাও শিকিউন, চোখ বন্ধ করে চুপ থাকা বৃদ্ধ—এটা একেবারে অপ্রত্যাশিত।

ঠাকুরদা কি তবে রাগ করেননি?

সময় গরমে ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, অবশেষে বৃদ্ধ জাও চোখ মেলে, বার্ধক্যে ভারী চোখের পাতায় শুধু সরু ফাঁক।

‘‘রুইশুয়েকে আমার কাছে ডাকো।’’

* * *

দুপুরের তপ্ত রোদের নিচে রুইশুয়ে দৌড়ে গিয়েছিল শেনশান মন্দিরে, প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নেয়। এমন গরমে ঘোড়ার গাড়িতে চড়া সত্যিই কষ্টকর, গাড়ির ভেতরটা একেবারে বন্ধ, বিন্দুমাত্র হাওয়া নেই। সে রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, পাহাড়ের ছায়া উপভোগ করে।

তাই তো, তৃতীয় স্যার ফিরতে চায় না। এখানে নিচের চেয়ে অনেক ঠান্ডা।

এ সময় ঠিক দুপুরের খাবার। ভিক্ষুরা দুপুরের পর কিছু খান না, তাই এটাই তাদের দিনের শ্রেষ্ঠ আহার। সে জানতে পারল, জাও শিহৌ কোথায়, তখনি ছুটে গেল তাঁর ঘরে।

দরজা ঠেলে দেখে, সে আনন্দের সঙ্গে খাবার গুটিয়ে গুটিয়ে খাচ্ছে।

রুইশুয়ে ঢুকতেই, জাও শিহৌ হাত ইশারা দিয়ে বলল, ‘‘এসো, এটা খাও, দা শিউ শিফু বানিয়েছে, দারুণ স্বাদ।’’

‘‘তৃতীয় স্যার...’’

সে কথা শেষ করতে না দিতেই জাও শিহৌ রুইশুয়ের মুখে খাবার গুঁজে দিল, ‘‘খাও, দুপুরের পর আর কিছু খাবার নেই, তুমি কি চাও আমি উপোস থাকি?’’

রুইশুয়ে এক কামড় দিয়ে বাকিটা হাতে নেয়, গিলে বলে, ‘‘ক্ষুধা পেলে ফিরে চলেন।’’

জাও শিহৌ মুখভর্তি খাবার নিয়ে বলে, ‘‘তুমি এলে কীভাবে?’’

‘‘ঠাকুরদা আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে ফিরিয়ে আনতে।’’

‘‘ফেরার দরকার কী? এখানে আমি খুব সুখে আছি। প্রতিদিন পড়তে, লিখতে হয় না, বিরক্তিকর কথাবার্তা শুনতে হয় না, কেন ফিরব? দেখো, এখানে ছোট ছোট সবজি দিয়ে বানানো খাবার, নাম রেখেছে সিলাওয়া, দা শিউ শিফু বলল, এ গুয়িয়াংয়ের বিখ্যাত নাশতা। এইভাবে পিঠায় সবজি ভরিয়ে, সস লাগিয়ে খাই—কী দারুণ! এটা খেয়ে আমিষ না খেয়ে থাকতে পারি। বলো তো, এই খাবার কি ঠিক ছোট্ট শিশুদের মতো দেখাচ্ছে না?’’

রুইশুয়ে মাথা নাড়ে।

‘‘আমি প্রথমবার দেখলাম। তবে ভেবে দেখলাম, আমাদের এলাকার বসন্ত রোলের মতোই তো, তফাত শুধু আমাদেরটা দু’পাশ থেকে মুড়ে ভাজা হয়।’’

রুইশুয়ে আবার মাথা নাড়ে। হঠাৎ সে সতর্ক হয়, জাও শিহৌ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয় ঘুরিয়েছে, ‘‘তৃতীয় স্যার, ঠাকুরদা আপনাকে ডেকেছেন।’’

জাও শিহৌ খাবারটা ফেলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে, হাতে মাথা দিয়ে, পা দোলাতে দোলাতে বলল, ‘‘ফিরছি না।’’

‘‘ঠাকুরদা খুব চিন্তিত, মা-ও চায় আপনি ফিরুন।’’

জাও শিহৌ সরাসরি কিছু বলে না, শুধু বলে, ‘‘তুমি খাও, দুপুরের রোদ পড়া অবধি থাকো, এখন বের হলে গরমে কষ্ট পাবে।’’

রুইশুয়ে বলে, ‘‘আপনি না ফিরলে আমিও ফিরব না।’’

জাও শিহৌ মজা করে তার কানের দুল টেনে বলল, ‘‘তাহলে তুমি এখানেই থাকো আমার সঙ্গে। তবে... মন্দিরে মেয়েদের থাকা মানা, আশেপাশে লোকও নেই, তাহলে গাড়িতে রাত কাটাবে। তবে পাহাড়ে নাকি বাঘ-ভালুক, তখন...’’ সে আচমকা ভয় দেখায়, রুইশুয়ে ভয়ে মাথা ঢেকে দেয়, ‘‘তখন তোমায় খেয়ে ফেলবে।’’

রুইশুয়ে চুপিচুপি চোখ তুলে দেখে, একটু পরে রেগে পা ঠুকে বলে, ‘‘আপনি মিথ্যা বলছেন।’’

জাও শিহৌ নির্বিকারভাবে বসে, সিলাওয়া খেতে খেতে বলে, ‘‘তাহলে থেকে দেখো।’’

রুইশুয়ে মন খারাপ করে বসে, ‘‘আপনি ফিরতে চান না কেন?’’

জাও শিহৌ গভীর দৃষ্টিতে বলে, ‘‘তুমি সত্যিই চাও আমি ফিরি?’’

রুইশুয়ে মাথা নাড়ে।

জাও শিহৌর চোখ চকচক করে ওঠে কিন্তু সে আবার মজার ছলে বলে, ‘‘আমি ফিরলে আবার পালিয়ে খেলতে যাব, তোমাকে দিয়ে লেখার কাজ করাব, মাঝে মাঝে কাঁদিয়ে দেব। তবুও চাও আমি ফিরি?’’

রুইশুয়ে তাকে কটমট করে চায়।

এই ছেলেটা!

জাও শিহৌ না দেখার ভান করে, ‘‘কান্নাকাটি করে ফেলে দাও, কেন ঠাকুরদার কথা এত শুনো?’’

রুইশুয়ে রেগে গলা তোলে, ‘‘আমার নাম কান্নাকাটি নয়!’’

জাও শিহৌ গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে, ‘‘ঠিক আছে, তাহলে তোমায় ডাকি সোনার দানা, নাকি ফুলি বিড়াল? তোমার যা পছন্দ! জানো, প্রথম দিন তোমায় যখন দেখেছিলাম, তুমি কাঁদছিলে, মুখে ময়লা, ঠিক ছোট বিড়ালের মতো। তাই তোমায় ডেকেছিলাম...’’

রুইশুয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে রাখে, তবু চোখ দিয়ে জল গড়ায়।

জাও শিহৌ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘‘আবার কান্না! এত বড় হয়েও কাঁদো?’’

রুইশুয়ে চোখ মুছে চুপ করে যায়।

জাও শিহৌ বলে, ‘‘কাঁদো না, কেন এমন? প্রথম দিন তোমায় দেখেই বলেছিলাম, তুমি ঠিক...’’

এ কথা শুনে রুইশুয়ে টেবিলে মাথা গুঁজে ফেলে।

জাও শিহৌ তাকে ধাক্কা দেয়।

রুইশুয়ের কাঁধ কাঁপে, চাপা কান্নার শব্দ শোনা যায়।

জাও শিহৌ বুঝতে পারে, সে বেশি মজা করেছে। এখনও আগের মতোই সে খেলায় অস্থির, তাই কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘‘আচ্ছা, আমার ভুল হয়েছে, আর ডাকব না। ক্ষমা চাওয়ার জন্য হাতজোড় করি।’’

রুইশুয়ে মুখ না তুলেই পড়ে থাকে।

জাও শিহৌ অবশেষে পাশে গিয়ে বসে বলে, ‘‘ভালো, এবার বুঝেছি। তোমার সঙ্গে ফিরব, কান্না থামাও!’’

রুইশুয়ে তৎক্ষণাৎ মুখ তুলে হাসে, ‘‘সত্যি? আপনি বললেন, এখনই ফিরবেন!’’ বলে দুষ্টু হাসে।

রুইশুয়ে মুখ তুলতেই জাও শিহৌ বুঝে যায়, সে ফাঁদে পড়েছে। কান্নার চিহ্ন নেই, টেবিলে মাথা গুঁজে ছিল শুধু অভিনয়ের জন্য!

তবু, জাও শিহৌও সহজে হার মানে না, সে রুইশুয়ের খুশি হয়ে যাওয়াটা থামিয়ে, হেসে মাথা নাড়ে, ‘‘ঠিক আছে। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’’

‘‘কি শর্ত? স্যার...’’

‘‘না মানলে ফিরব না।’’

রুইশুয়ে তাড়াতাড়ি হ্যাঁ বলে।

জাও শিহৌ চিবুক চুলকে বলল, ‘‘সহজ শর্ত। এখানে থাকি কারণ রান্না ভালো লাগে, যদি ফিরতে হয়, তবে তোমাকেও এক পদ রান্না করতে হবে।’’

রুইশুয়ে বলে, ‘‘এ তো সহজ, আমি বাবাকে বলব আপনার প্রিয় পদ রান্না করতে।’’

‘‘থামো,’’ জাও শিহৌ বলে, আঙুল তুলে, ‘‘শর্ত আছে—প্রথমত, তোমাকেই রান্না করতে হবে।’’

রুইশুয়ে অবাক, ‘‘আমি? আমি কীভাবে?’’

‘‘তোমাকেই। তুমি পারো না?’’ সে অন্যদিকে তাকায়, যেন তুমিই পারো না মানে আমি ফিরব না।

রুইশুয়ে বলে, ‘‘আমি করব।’’

জাও শিহৌ হাসে, আবার আঙুল তুলে, ‘‘দ্বিতীয়ত, তোমার রান্না ভিক্ষুরা খেয়ে প্রশংসা করতে হবে।’’

রুইশুয়ে মাথা নাড়ে, মানে রাজি হয়। নিরামিষ পদ বাবা ভালো জানে, শিখে নেবে।

‘‘তৃতীয়...’’

জাও শিহৌ থামতেই রুইশুয়ে চাপে পড়ে, ‘‘তৃতীয়টা কী, বলুন!’’

জাও শিহৌ রহস্যময় হাসি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘‘তৃতীয়ত, তোমাকে আমিষ পদ বানাতে হবে।’’

রুইশুয়ে সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে, ‘‘এ কেমন? মন্দিরে আমিষ রান্না কীভাবে? ভিক্ষুরা নিয়ম ভাঙবে কেন?’’

জাও শিহৌ কাঁধ ঝাঁকিয়ে, বিছানায় গা এলিয়ে, চোখ বুজে, ‘‘তুমি না মানলে আমি ফিরব না।’’

রুইশুয়ে দেখে, সে কিছুতেই রাজি হবে না, তাই বলে, ‘‘ঠিক আছে, আমি রাজি।’’

জাও শিহৌ আরাম করে গা এলিয়ে বলে, ‘‘তবেই হলো। আকাশে ওড়া, মাটিতে হাঁটা, জলে সাঁতার, যা ইচ্ছে—সব চাই। তবে সত্যি কথা বলতে, মন্দিরকে অপবিত্র করা যাবে না, তাই...’’

একদিকে ভিক্ষুদের নিয়ম ভাঙাতে চাইছে, আবার অন্যদিকে পাপ চাইছে না—এ কেমন কথা?

‘‘তাই কী?’’

‘‘তাই, খাবারগুলো মন্দিরের বাইরে রাখতে হবে, ভিক্ষুরা যেন নিজেরা এসে খান। তিনটা শর্তই পূরণ হলে তুমি জয়ী।’’ সব কথা বলে জাও শিহৌ পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।

* * *

সিলাওয়া: গুয়িয়াংয়ের এক ধরনের নাশতা। কারণ এর আকৃতি শিশুর মতো মোড়ানো, তাই এই নাম। মোড়ানো হয় চালের পাতলা পিঠায়, নানা সবজি কুচি দিয়ে, সাথে সস।

আসলে হেনানের লাওমোও অনেকটা একইরকম। তবে ওটা অনেকটা মোটা, মজবুত এবং বিশাল, একটি মেয়ের জন্য একটি যথেষ্ট।

মনে আছে, একবার বাড়ি থেকে পিঠা নিয়ে, ঠাণ্ডা তরকারি কিনে মুড়িয়ে খেয়েছিলাম—ভীষণ পেট ভরে গিয়েছিল~

* * *

রাতের বেলায় আরও একটি নতুন অধ্যায় আসছে।