বাহাত্তরতম অধ্যায়: এই গানটি আমি লিখেছি
সুচিন গানটি গেয়ে শেষ করেছে!
আর অনেকক্ষণ আগেই শেষ করেছে, তিন-চার মিনিট তো হয়েই গেছে!
কিন্তু সবাই শুধু মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে, কারও মুখে কোনো কথা নেই, মনে ভারী বিষণ্নতা।
অনেকক্ষণ পরে, যখন সবার মনের অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলো, তখন সুচিন বলল, ‘‘থাক, আমি তোমাদের আরেকটা গান শেখাই...’’
কিন্তু তার কথা শেষ হতেই বাধা পড়ল, ‘‘এই গানটাই থাক!’’,班ের নেতা বলল সবার আগে।
‘‘হ্যাঁ, আমরা এই গানটাই শিখব!’’
‘‘এই গানটাই!’’,
‘‘শুধু এই গানটাই শিখব!’’
অনেক সৈনিক চোখ মুছে জোর দিয়ে বলল।
‘‘গানটার নাম কী? বন্ধুকে বিদায়?’’ সহকারী班 কমান্ডার জানতে চাইল।
সুচিন মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল।
পৃথিবীতে এই গানের আরেকটা নাম ছিল, কিন্তু সেনাবাহিনীর ভাইয়েরা সবাই একে ‘‘বন্ধুকে বিদায়’’ বলতেই ভালোবাসত, সুচিনও মনে করত এই নামটাই সবচেয়ে মানানসই।
‘‘সুচিন, শুরু করো।’’
‘‘হ্যাঁ, শুরু করো, সবাই মন দাও, চেষ্টা করো সবাই শিখে নিতে, একটু পরে যখন ফিরব, আমরা গান গাইতে গাইতে ফিরব!’’, নেতা নির্দেশ দিল।
‘‘হ্যাঁ, একটু পরে আমরা গান গাইতে গাইতে ফিরব!’’
সবাই সায় দিল, বিশেষ করে পুরনো সৈনিকরা, আরও বেশি আবেগাপ্লুত।
‘‘ভালো, তাহলে শুরু করি, প্রথম লাইন, ‘বন্ধুকে বিদায়, শুরু হলো যাত্রা...’’
সুচিন মন দিয়ে সবাইকে শেখাতে শুরু করল!
এই গানটা ভালোভাবে গাইতে আসলে সহজ নয়, তবে সৈনিকদের গান গাওয়ায় এত নিয়মকানুন নেই, জোরে গাওয়াই যথেষ্ট, সুর একটু এদিক-সেদিক হলেও চলবে!
গানটা সবার মনে দোলা দেয়, গাইতে গিয়ে আবেগে ভেসে যায় সবাই, ফলে সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শেখে, প্রাণ ঢেলে গায়।
সব লাইন একবার করে শেখানোর পর, সুচিন বলল, ‘‘তাহলে এবার সবাই একসঙ্গে গাই!’
‘‘ভালো!’’
সবাই একসঙ্গে সাড়া দিল।
‘‘বন্ধুকে বিদায়, শুরু হলো যাত্রা, প্রস্তুত, শুরু...’’ সুচিন সবাইকে পরিচালনা করল।
টার্গেট মাঠের ওদিকে তখন বন্দুকের গুলির শব্দ, প্রাণবন্ত অনুশীলন চলছে!
কমান্ডার আর প্রশিক্ষক দুজনেই খুব সন্তুষ্ট, মাথা নেড়ে প্রশংসা করল।
ঠিক তখনই সুচিনদের গানের সুর ভেসে এল।
‘‘এই ছোট্ট দুষ্টু ছেলেগুলো! অবসর পেয়ে গান গাইছে দেখি!’’ কমান্ডার হেসে গাল দিল।
প্রশিক্ষক কান পাতল, ‘‘ওরা কী গান গাইছে? আগে শুনিনি তো?’’
কমান্ডারও কিছুক্ষণ শুনল, ‘‘আমি-ও শুনিনি! মনে হয় নতুন কোনো গান! উহ, বলতে গেলে, কতদিন নতুন গান ডাউনলোড করিনি, অনেক পিছিয়ে পড়েছি, এবার বাদ পড়ে যাব! আচ্ছা, কোনোদিন শহরে গিয়ে একটু গান গাইব নাকি?’’
প্রশিক্ষক শুনে মাথা নাড়ল, ‘‘এ কয়দিন খুব ব্যস্ত, পরে দেখা যাবে!’’
বিষয় ঘোরাতে গিয়ে বলল, ‘‘বিরক্তিকর ব্যাপার! এমন গান আগে কখনো শুনিনি কেন? সাম্প্রতিক কালে তো আর নতুন কোনো সামরিক গান বের হয়নি! চল, গিয়ে দেখি না?’’
দুজনেই ওখানে আর থাকতে চাইছিল না, তাই নিরবে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হাঁটা ধরল।
‘‘তোমরা গান গাইছ?’’ কমান্ডার হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল।
‘‘সালাম কমান্ডার, প্রশিক্ষক, সুচিন আমাদের গান শেখাচ্ছে, আপনারা চাইলে একসঙ্গে গান শিখতে পারেন, এই গানটা খুবই সুন্দর!’’班ের প্রধান উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
‘‘হ্যাঁ, আপনারাও শিখুন!’’
সবাই সায় দিল।
অনেক পুরনো সৈনিক আসলে মজার জন্যই বলল।
কমান্ডারের গান গাওয়া পুরো ইউনিটে বিখ্যাত—সবার চেয়ে বেশি সুর ভেঙে যায়।
আর ভয়ের কথা, তার কণ্ঠ সবচেয়ে জোরে, একা গাইলেও গোটা ইউনিটে শোনা যায়।
তার আবার কোনো লজ্জা নেই, বরং যত গায় ততই মেতে ওঠে, এমনকি কখনও নাচতেও শুরু করে!
‘‘ভালো, সুচিন, তাহলে আবার শুরু থেকে শেখাও, আমি আর প্রশিক্ষকও শিখে নিই’’, কমান্ডার উৎসাহ নিয়ে বলল, আসলে সে গান গাইতে পছন্দ করে—না, বলা ভালো, চেঁচিয়ে গান গাওয়ায় পারদর্শী!
সুচিনও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘‘ভালো, তাহলে আবার শুরু করি, প্রথম লাইন, ‘বন্ধুকে বিদায়, শুরু হলো যাত্রা...’’
সুচিন মন দিয়ে শেখাল, সবাই মন দিয়ে শিখল!
কমান্ডার আর প্রশিক্ষক শুরুতে শুধু মজা করতেই এসেছিল, কিন্তু গাইতে গাইতে প্রশিক্ষক চুপ করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
কমান্ডার মুখ না ঘুরালেও মাথা তুলে তাকিয়ে ছিল, তার চোখের কোনায় টলমল করছে অশ্রু।
বহু বছর ধরে সেনাবাহিনীতে থাকা এই অভিজ্ঞ সৈনিকদের জন্য এই গানটা অন্যরকম আবেগের, অনেক গভীর!
শেষ পর্যন্ত, কমান্ডার উঠে দাঁড়িয়ে বন্দুক অনুশীলন শেষে আসা সৈনিকদের ডাক দিল, ‘‘যারা অনুশীলন শেষ করেছ, সবাই এখানে এসো!’’
সবাই এলে কমান্ডার সুচিনকে বলল, ‘‘সবাইকে শিখিয়ে দাও, একটু পর ফেরার সময় সবাই মিলে এই গান গাইব!’’
‘‘ঠিক আছে!’’ সুচিন উত্তর দিল।
এভাবে, এই দিনের কর্মসূচি ছিল ব্যস্ত আর টানটান, কারও যদি গুলিচালনার অনুশীলন থাকে, সে মাঠে গিয়ে মনোযোগ দেয়, বাকিরা এখানে থেকে গান শেখে!
এভাবেই দিনটা কেটে গেল!
দেখতে দেখতে বিকেল পাঁচটা বেজে গেল, কমান্ডার ঘড়ি দেখে সবাইকে ডাক দিল।
‘‘সুচিন, আবার সবাইকে শেখাও!’’ প্রশিক্ষক বলল।
‘‘ঠিক আছে!’’
‘‘সবাই মনোযোগ দাও, একটু পর সবাই গান গাইতে গাইতে ফিরবে, কেউ যদি খারাপ গাও, আওয়াজ কম হয়, তাহলে আজ রাতের খাবার পাবে না!’’ কমান্ডার কড়া ভাষায় বলল।
কমান্ডার কথা শেষ করতেই,班ের এক প্রধান জোরে বলল, ‘‘সালাম!’’
‘‘বলো’’
‘‘কমান্ডার, প্রশিক্ষক, আমাদের班 আজ তিনবার গুলিচালনার অনুশীলন করেছে, আমরা শেষ করে আসার পর, সবাই গান শিখে ফেলেছে, আমাদের班ের ছেলেরা কয়েক লাইনই শিখেছে, আমাদের班ের জন্য কি একটু ছাড় হবে?’’
কমান্ডার আর প্রশিক্ষক একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, ‘‘তোমাদের班 আলাদা, আজ ছাড় দিলাম, তবে আজ রাতে শিখে ফেলতেই হবে, নইলে কালকের সকালের খাবার পাবে না!’’
‘‘দায়িত্ব পালন করব!’’
‘‘সালাম——’’班প্রধান আবার ডাক দিল।
‘‘আর কী?’’ কমান্ডার একটু বিরক্ত।
‘‘কমান্ডার, গানটার নাম কী, কোথায় ডাউনলোড করব, আমি বাড়ি গিয়ে ডাউনলোড করি, তারপর সবাইকে শেখাব।’’
কমান্ডার সুচিনের দিকে তাকাল, ‘‘সুচিন, বলো!’’
‘‘কমান্ডার, প্রশিক্ষক, গানটার নাম ‘বন্ধুকে বিদায়’, ডাউনলোডের ব্যাপারে...কমান্ডার, প্রশিক্ষক, এই গানটা এখনো ইন্টারনেটে পাওয়া যায় না!’’
‘‘কী?’’ কমান্ডার যেন ভুল শুনল।
‘‘সুচিন, এখন মজা করার সময় না! সিরিয়াস হও’’, প্রশিক্ষকের মুখ গম্ভীর।
‘‘এই গানটা আমি-ই লিখেছি, কোথাও প্রকাশও হয়নি, তাই নেটেও নেই!’’ সুচিন বলল।
পৃথিবী মুহূর্তে নীরব।
মনে হলো, কোনো মহান জাদুকর যেন গোটা পৃথিবীর সব শব্দ চুষে নিয়েছে!
সবাই বোকার মতো সুচিনের দিকে তাকিয়ে রইল, অনেকক্ষণ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
জানি না কতক্ষণ পর কেউ সাড়া দিল।
‘‘সুচিন, আমরা সৈনিক, প্রতিটা কথার দায় নিতে হয়!’’ কমান্ডার গম্ভীর গলায় বলল।
‘‘‘বন্ধুকে বিদায়’ তুমি লিখেছ? তুমি গানও লিখতে পারো?’’ প্রশিক্ষক অবাক হয়ে ভ্রু তুলল।
দলের কিছু সৈনিক হেসে বলল, ‘‘অপবাদ জুড়তে দেখা যায়, কিন্তু এতটা বাড়াবাড়ি কেউ করে না!’’
সুচিন বুক টান করে, জোরে বলল, ‘‘কমান্ডার, এই গানটা আমি লিখেছি কি না, আপনি আর প্রশিক্ষক কপিরাইট অফিসের ওয়েবসাইটে খুঁজুন, ‘বন্ধুকে বিদায়’ অথবা কোনো লাইন লিখলেই কপিরাইট তথ্য চলে আসবে—‘বন্ধুকে বিদায়’, গীতিকার সুচিন, সুরকার সুচিন!’’
আচ্ছা?
সবাই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল!
‘‘ওরে বাবা!’’
‘‘তুই...সুচিন...তুই মানুষ তো? কথা লেখা, সুর করা—সবই পারিস?’’
‘‘তাই তো সবাই বলে, লেখক আর স্রষ্টা এক জাতের! উপন্যাস লিখতে পারলে গানও লেখা যায়!’’